রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবার পর প্রথমবারের মতো সিলেট যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দিনব্যাপী বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করবেন, বিকেলে অংশ নেবেন নাগরিক সংবর্ধনায়।
রাষ্ট্রপতি কোনো রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নন; তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক এবং দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সমগ্র জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সিলেটে রাষ্ট্রপতির আগমন উপলক্ষে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। অনুষ্ঠান আয়োজনের সার্বিক প্রক্রিয়া, অতিথি নির্বাচন এবং প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে পক্ষপাত ও একপাক্ষিকতার প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে, রাষ্ট্রপতির মতো সর্বজনীন সাংবিধানিক পদের সংবর্ধনার ক্ষেত্রে অতীতে সর্বদলীয় ও সর্বজনীন ‘নাগরিক কমিটি’ গঠনের রেওয়াজ থাকলেও এবার তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। একটি দলীয় ও ব্যক্তি-বলয়ের নিয়ন্ত্রণে অনুষ্ঠান পরিচালনা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিলেটের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
সর্বজনীন নাগরিক কমিটির অনুপস্থিতি
সাধারণত রাষ্ট্রপতির নাগরিক সংবর্ধনা উপলক্ষে স্থানীয় বিশিষ্ট নাগরিক, প্রবীণ রাজনীতিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী प्रतिनिधियों সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের নাগরিক কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এবার কোনো নাগরিক কমিটি গঠন না করে পুরো আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সিলেট সিটি কর্পোরেশনকে (সিসিক)।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের। পাশাপাশি প্রধান অতিথি ও বিশেষ বক্তা হিসেবে বাণিজ্যিক দিক এবং বিএনপির স্থানীয় রাজনীতির প্রভাবশালী নেতাদের নাম সামনে আসছে। ফলে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আয়োজিত হলেও পুরো অনুষ্ঠানটিকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের বলয়ভুক্ত করা হয়েছে বলে সমালোচকরা দাবি করছেন।
মুক্তাদিরের প্রভাবের অভিযোগ ও রাজনৈতিক বলয়কেন্দ্রিকতা
সমালোচক ও স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ, পুরো আয়োজনেই বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সমর্থিত একটি গোষ্ঠীর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনাকে নিরপেক্ষ নাগরিক আয়োজনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
সিলেট বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও বলয়ভিত্তিক রাজনীতির খবর গণমাধ্যমের প্রকাশিত হয়ে আসছে। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং প্রাক্তন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পৃথক রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব এই রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনাতেও পড়েছে বলে ধারণা করছেন বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি অংশ।
এমনকি, আয়োজনের অব্যবস্থাপনা ও একপাক্ষিকতার অভিযোগ তুলে উক্ত রাজনৈতিক বলয়েরই সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের একটি অংশ অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—যে আয়োজন নিয়ে আয়োজক বলয়ের ঘনিষ্ঠ অংশেই অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা কীভাবে গোটা সিলেটের প্রতিনিধিত্বশীল নাগরিক সংবর্ধনা হতে পারে?
বিরোধী দল, সংখ্যালঘু ও পেশাজীবীদের উপেক্ষার অভিযোগ:
রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা হলেও আয়োজনে সর্বদলীয় ও সর্বজনীন সামাজিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হওয়ার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে:
রাজনৈতিক দল: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেলা ও মহানগর পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃত্বকে কোনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে দলটির পক্ষ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। একইভাবে বামপন্থী রাজনৈতিক দল, জাসদ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক মতের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণের বাইরে রাখা হয়েছে।
ধর্মীয় ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী: ইসলামপন্থী বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় সংগঠন, খ্রিস্টান মিশনারি, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদেরও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। সনাতন ধর্মাবলম্বী (হিন্দু) সম্প্রদায়ের কয়েকজন সর্বজনীন ও গ্রহণযোগ্য প্রবীণ নেতাকে আমন্ত্রণের বাইরে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মূলধারার ব্যবসায়ী সমাজ: সিলেটের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় চেম্বার অব কমার্স ও মূলধারার ব্যবসায়ী নেতাদের বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
বিএনপির ত্যাগী নেতাদের ক্ষোভ ও আওয়ামী-ঘনিষ্ঠদের Patronage দেওয়ার অভিযোগ:
শুধু বিরোধী দল বা সামাজিক গোষ্ঠীই নয়, ক্ষমতাসীন বা প্রধান দলগুলোর তৃণমূল ও ত্যাগী নেতাদের মধ্যেও এই আয়োজন নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। রাজপথের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের অনেককেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাখা হয়নি।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের অভিযোগ, দলের রাজপথের নেতাদের বাদ দিয়ে অতীতে রাজনৈতিক সুবিধাভোগী এবং বিগত সরকারের আমলে প্রভাব বিস্তারে অভিযুক্ত কিছু ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির পদচারণা এই আয়োজনে বেশি দেখা যাচ্ছে। এতে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি রাষ্ট্রপতির মর্যাদা রক্ষার চেয়ে ব্যক্তি বা বলয়কে তুষ্ট করার আয়োজনে রূপ নিয়েছে বলে মন্তব্য করছেন প্রবীণ রাজনীতিকরা।
৬০০ অতিথির তালিকা ও স্থান নির্বাচন ঘিরে অব্যবস্থাপনা:
অনুষ্ঠানে প্রায় ৬০০ অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও আমন্ত্রিতদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তার একটি বড় অংশই সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলছেন—এটি যদি একটি ‘নাগরিক সংবর্ধনা’ হয়, তবে সেখানে সাধারণ নাগরিক সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবীদের বাদ দিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের দিয়ে আসন পূর্ণ করার পেছনে কী উদ্দেশ্য কাজ করছে?
তাছাড়া, স্থান নির্বাচন নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সামনের তুলনামূলক ছোট পরিসরের স্থানে এত বড় আয়োজনের আয়োজন করা হয়েছে। ফলে নিরাপত্তার কড়াকড়ি, প্রবেশগম্যতা, বসার অভাব এবং সার্বিক অতিথি ব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতা বনাম দলীয় বলয়ের প্রভাব:
সব মিলিয়ে সিলেটের সর্বস্তরের মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে—রাষ্ট্রপতির মতো একটি সর্বজনীন ও নিরপেক্ষ সাংবিধানিক পদকে ঘিরে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি আসলে কতটা প্রতিনিধিত্বশীল?
রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্র ও জাতির প্রতীক, যিনি দল-মতের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। সেখানে তাঁর সংবর্ধনাকে ঘিরে কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব বিস্তার এবং বিশাল একটি জনসংখ্যা ও অংশীদারদের বাদ পড়া সংবর্ধনার মূল চেতনার পরিপন্থী। সিলেটে রাষ্ট্রপতির এই আগমনকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি সর্বজনীন, নিরপেক্ষ ও স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক আয়োজনের দাবি এখনো সিলেটের সচেতন সুশীল সমাজের।
সূত্র- Taib Ahmed - তাইয়িব আহমেদ's post