পালিয়ে যাওয়ার দীর্ঘ সময় পর রয়টার্সকে দেয়া এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছিলেন। চলতি বছর ১০ জুলাই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হওয়ার পর স্বভাবতই বিষয়টি ভারত ও বাংলাদেশ জুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। বিশেষ করে দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে নতুন ‘আশা’ জেগে ওঠে। এরপর ৩ মাস অতিবাহিত হলেও তার ফেরার বাস্তবসম্মত পথরেখা স্পষ্ট না হওয়ায় বাংলাদেশে অবস্থানরত অনুসারীদের সেই আশা ফিঁকে হয়ে আসে। ডালপালা মেলে নানা গুঞ্জন। ফলে দিন যত যাচ্ছে তত ফিকে হয়ে আসছে শেখ হাসিনার দেশের ফেরার সম্ভাবনা। দেশে প্রবল বিরোধিতা তো আছেই (যেখানে সরকারি দল ও বিরোধী দলের নীতিগত অবস্থান এক), ছন্নছাড়া দল ও দলের নেতাকর্মীরা, মৃত্যুদণ্ডের রায়, দলের নেতৃত্ব বিরোধের পাশাপাশি খোদ ভারত সরকারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এই অনিশ্চয়তা প্রকট করে তুলেছে। হাসিনার প্রত্যাবর্তনের আলাপে সবচেয়ে বেশি জটিলতা তৈরি করেছে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার ও আমলাতন্ত্রের দ্বন্দ্ব এবং শেখ সেলিমকে ‘হুট’ করে বিকল্প নেতা হিসাবে ঘোষণার পর তা নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরোধ। অনেকে মনে করেন এটি দলটির বর্তমান সংকট উৎরানো দূরে থাক, বরং নতুন করে ‘গৃহদাহ’ তৈরি করেছে। আর শেখ হাসিনার অবর্তমানে দলের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ শেষ পর্যন্ত বানরের পিঠা ভাগ করার মতো দলকে টুকরোটুকরো করেও ফেলতে পারে। বিষয়গুলো নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমেও আসছে নানা খবর। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের চলতি সপ্তাহের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী লবি ভারত-বাংলাদেশের টানাপোড়েন কমিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ ভেস্তে দিতে ভূমিকা রাখছে। ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলের সূত্র ব্যবহার করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একজন নন-আইএফএস কর্মকর্তা ও রাজনীতিক দিনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার নিয়োগ দেওয়ায় অসন্তুষ্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA)। চলতি বছরের শুরুতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে এক বৈঠকে মোদি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোতে আরও নন-আইএফএস ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। মূলত এরপর থেকেই এ বিষয়ে ভারত সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি আমলাতন্ত্রের অসন্তোষ বাড়ে। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব কমাতে দিনেশ ত্রিবেদীর নানামুখি উদ্যোগ—এমনকি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে সম্মত করানোর প্রচেষ্টাও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। সফরের দিনক্ষণ ফাঁস হওয়ার পর দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করে। বলা হয়, এই বিরোধের ফল থেকেই মূলত প্রচলিত কূটনৈতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে একটি পক্ষ দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে শেখ হাসিনাকে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের সুযোগ করে দেয়। সেখানে তিনি দুই তৃতীয়াংশ ভোটে জেতা বিএনপি সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। স্মরণ করা যেতে পারে এক বছর আগে দিল্লি প্রেস ক্লাবে হাসিনার এরকমই একটি প্রস্তাবিত সংবাদ সম্মেলন ঠেকিয়ে দিয়েছিল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরআগে ২০১৮ সালেও বাংলাদেশে কারাবন্দি প্রয়াত খালেদা জিয়ার পক্ষে বক্তব্য দিতে চাওয়া এক ব্রিটিশ দূতকে সংবাদ সম্মেলনেরই অনুমতি দেওয়া হয়নি। হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পরই মূলত ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক চুড়ান্ত তলানিতে পৌঁছে।
যদিও চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক সরকার হিসাবে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুদেশের সম্পর্কের বরফ গলার ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের দুই সপ্তাহ পর পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করতে গেলে সরকারের বাধার মুখে পড়ে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব। ওই অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা কয়েকজন বক্তা অতিথি ছিলেন। সরকার অনুষ্ঠানটি বাতিলের নির্দেশ দেয় এবং প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য ক্লাব প্রাঙ্গণে অবস্থান নেয়। এদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই আপসহীন অবস্থানের প্রতিধ্বনি পাওয়া যাচ্ছে সাবেক কিছু ভারতীয় কূটনীতিকের লেখাতেও। তাদের কেউ কেউ ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারণেই আসলে তারেক রহমানের ভারত সফর বাতিল হয়েছিল। দুই দেশের মধ্যে তিক্ততা বাড়ার প্রেক্ষিতে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনেও তারেক রহমান যোগ দেবেন না। ত্রিবেদীর কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে একটি ধারা তৈরি হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল ঢাকার সাথে সম্পর্ক মেরামত করা। অন্যদিকে দিল্লি থেকে হাসিনাকে সরকারবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার মাঝে আরেকটি ধারা স্পষ্ট হয়, যা মোটেও ইতিবাচক ছিল না। ভারতের পররাষ্ট্র ব্যবস্থার একটি অংশ এখনো আবেগীয় বা কৌশলগতভাবে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ আমলের সাথে জড়িয়ে রয়েছে, যা নতুন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সাথে বিশ্বাস গড়ে তোলা কঠিন করে তুলছে। একই সাথে সদিচ্ছা প্রকাশ, হাসিনার কাছ থেকে প্রকাশ্যে সমালোচনা, দ্বিপক্ষীয় সফর বাতিল এবং আমলাতান্ত্রিক বাধার উপস্থিতি প্রমাণ করে যে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে। ভারত মূলত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অভিবাসন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর চরমপন্থা বৃদ্ধির ঝুঁকি এবং চীন ও পাকিস্তানের প্রভাব কমানোকে অগ্রাধিকার দেয়। বিএনপি আমলে ঢাকার চীন সফর, বেইজিংয়ের সাথে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা এবং মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো জোটে যোগদানের কথা ভারতকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। হাসিনা আমলে ভারত বাংলাদেশকে একটি ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার মনে করত। ২০২৪ সালের আগস্টের পর ইউনূস সরকারের আমলে ভিসা স্থগিত, উসকানিমূলক বক্তব্য ও সীমান্ত উত্তেজনার দরুন দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
তবে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভারত রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে—যেমন ত্রিবেদীর নিয়োগ, ক্যাবিনেট পদমর্যাদার প্রটোকল, ট্রাভেল ভিসা চালু করা, তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ এবং ব্রিকস সম্মেলনে যোগদানের মতো পদক্ষেপ। ভারতের সংবাদ মাধ্যম দ্য ওয়ালকে সম্প্রতি দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘প্রত্যেকের জীবনের ঝুঁকি আছে। আমি দেশে ফেরার জন্য নির্দেশনা দিয়ে কাউকে বিপদে ফেলতে চাই না।’ দ্য ওয়ালের এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে তার দেশে ফেরা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে একাধিক বিস্ফোরক মন্তব্য করেন তিনি। এই সাক্ষাৎকারেই তিনি তার পরে দলের শীর্ষ নেতা হিসাবে শেখ সেলিমের নাম ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “এখন শেখ সেলিম সিনিয়র মোস্ট প্রেসিডিয়াম সদস্য। আমার অনুপস্থিতিতে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।” শেখ সেলিমকে উত্তরসূরী ঘোষণাও দলের আভ্যন্তরিণ বিরোধকে উসকে দিয়েছে। ‘শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগের একাংশের হতাশা, কলকাতায় শেখ হেলালের বাসায় বৈঠকে ক্ষোভ’ শীর্ষক খবরে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সভাপতিত্ব করার ইঙ্গিতে দলের একটি অংশের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কলকাতার নিউ টাউনে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই, সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিনের বাসায় এক বৈঠকে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা প্রকাশ্যেই এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল হাসান রিপনসহ ৮-১০ জন নেতা। এসবকিছুই একটি বিষয়কে স্পষ্ট করে তুলছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাইরেও আওয়ামী লীগের স্টেকহোল্ডারদের মধ্যেই বিশৃঙ্খলা বিস্তৃত হয়েছে। একদিকে দলটির পৃষ্ঠপোষক ভারত সরকারের মধ্যেই নানামুখি বিভেদ, লক্ষ্যহীন পররাষ্ট্র নীতি ও কৌশলের অভাব, আরেকদিকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যেই প্রকট বিভেদ শুধু আওয়ামী লীগকেই অনিশ্চিত অবস্থায় ফেলেনি, একইসঙ্গে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গকেও সুদূর পরাহত করে তুলেছে।
ফাতহুম মুবীন, সাংবাদিক