রাজস্ব সংকট ও অন্তর্ভুক্তির চ্যালেঞ্জ

মামুন রশীদ | মতামত
সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৫
রাজস্ব সংকট ও অন্তর্ভুক্তির চ্যালেঞ্জ

উন্নয়ন ও পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন থাকলেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশ গত তিন দশকে এক উৎসাহব্যঞ্জক অর্থনৈতিক অভিযাত্রা অতিক্রম করেছে। তৈরি পোশাক শিল্পের উত্থান, প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহ, দারিদ্র্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন কিংবা অবকাঠামো বিনিয়োগ–প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে। প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ থাকলেও পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল কিংবা যমুনা রেলসেতুর মতো প্রকল্প একদিকে উন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সক্ষমতার খবর পৌঁছে দিয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সাফল্যের এই আলোছায়ার ভেতরে কিছু গভীর সংকট জমছে, যেগুলো উপেক্ষা করলে টেকসই উন্নয়নের পথ রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফিনডেক্স রিপোর্ট ২০২৫ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণের তথ্য আমাদের বাস্তবতাকে স্পষ্ট করেছে। রিপোর্ট অনুসারে, একদিকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার কমছে, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণে দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা অর্থনীতির ভেতরে স্থিতিশীলতার ঘাটতি তৈরি করছে। এই দুই খাতের দুর্বলতা আজ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মূল কাঠামোকেই যেন প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর মাত্র ৪৩ শতাংশ ব্যাংক বা মোবাইল মানি অ্যাকাউন্টধারী। ২০২১ সালে এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ১০ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং অন্তর্ভুক্তির হার ৭৪ থেকে ৭৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ৮৯ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কা ৮০ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যেখানে বাংলাদেশ কেবল পাকিস্তানের চেয়ে সামান্য এগিয়ে।

মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) চিত্রও বেশ হতাশাজনক। ২০২১ সালে যেখানে ২৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এমএফএস ব্যবহার করতেন, সেখানে ২০২৪ সালে এ হার নেমে এসেছে ২০ শতাংশে। ব্যাংক হিসাবধারীর হারও ২৪ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ শতাংশে। অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা অবশ্য বলছেন, এনআইডিভিত্তিক একক হিসাব চালুর কারণে ভুয়া অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়েছে। তবে এর গভীরে রয়েছে গ্রাহকের আস্থাহীনতা, সেবার মানের ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, নারী-পুরুষের বৈষম্য। ২০২১ সালে যেখানে জেন্ডার গ্যাপ ছিল ১৯ শতাংশ পয়েন্ট, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশে। বর্তমানে পুরুষদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট থাকলেও নারীর ক্ষেত্রে তা মাত্র ৩৩ শতাংশ। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে এ বৈষম্য নিঃসন্দেহে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করছে।
বাংলাদেশে ১২ কোটি ২৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে ৬ কোটি ৯৭ লাখ মানুষের কোনো ধরনের ব্যাংকিং বা আর্থিক অ্যাকাউন্ট নেই। এর ফলে অর্থনীতি এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আর্থিক প্রবাহের বৃহৎ অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক খাতেই রয়ে গেছে।

অন্যদিকে রাজস্ব খাতের চিত্রও তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। টানা ১৩ বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা কম। প্রাথমিকভাবে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ধরা হলেও বছরের মাঝপথে কমানোর পরও সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এর ফলে উন্নয়ন প্রকল্পে বিলম্ব ঘটছে, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট বাড়ছে, সরকার আরও বেশি ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪৯ শতাংশ।

ইতোমধ্যে অনেকবার উল্লেখিত হয়েছে–কর ফাঁকি, কর অব্যাহতির অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাই রাজস্ব সংকটের মূল কারণ। কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কেবল কর ফাঁকির কারণেই ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি এসেছে করপোরেট খাত থেকে। রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যার ফলে সুদের খরচ বেড়েছে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হচ্ছে, ভোক্তা ব্যয় কমছে এবং প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাত, যা প্রকৃতপক্ষে কর্মসংস্থানের প্রধান বাহক, সেই খাতই সবচেয়ে বেশি তহবিল বঞ্চিত হচ্ছে।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরেছে। পদ্মা সেতু ও যমুনা রেলসেতু দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের ব্যাংক খাত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রাজস্ব প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কারের পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।
বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রসার–এ দুই দিককে সমান্তরালে এগিয়ে নেওয়া ছাড়া সামনে টেকসই উন্নয়নের পথ নেই। কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও অটোমেশন নিশ্চিত করতে হবে, কর ফাঁকি দমনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, আবার একই সঙ্গে করনীতি হতে হবে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে তুলনীয় ও বিনিয়োগবান্ধব। ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে উদ্ভাবনী সেবা, গ্রাহক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা জোরদারের মাধ্যমে। নারীর জন্য আলাদা প্রণোদনা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করাও জরুরি।

আমরা জানি, অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো রাজস্ব এবং তার স্নায়ুতন্ত্র হলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। এই দুই ক্ষেত্রকে শক্তিশালী না করলে বাংলাদেশের উন্নয়ন টেকসই হবে না। আমাদের এখন কথা আর আলাপচারিতার সময় নয়, সময় এসেছে কাঠামোগত সংস্কার ও বাস্তবায়নের। একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নয়, বরং মানুষের অন্তর্ভুক্তি ও আস্থার ওপর দাঁড়ায়। বাংলাদেশের সামনে সেই আস্থা ও অন্তর্ভুক্তির নতুন যাত্রাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ধীরে ধীরে আবার সেই আগুনে ঘি ঢালছে ক্রমাগত মতবিরোধ। তার সঙ্গে গন্তব্যের ব্যাপারে অস্পষ্টতাও অনেকাংশে দায়ী।
উন্নয়নশীল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জনগণের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ। কিন্তু বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণের হার দীর্ঘদিন ধরেই নিম্ন এবং তা প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। দেশের অর্থনীতি টেকসই রাখতে হলে রাজস্ব সংকট উত্তরণের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির দিকটি অগ্রাধিকার দিতে হবে। উন্নয়নের সুফল যদি সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছায়, তবে অর্থনীতির অগ্রযাত্রা কেবল সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধি 
নয়, ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনেও ভূমিকা রাখবে।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক

সূত্র- সমকাল

মতামত'র অন্যান্য খবর

সর্বশেষ