দেরিতে হলেও ২০২২ সালে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আনুষ্ঠানিকভাবে আউটকাম-বেজড এডুকেশন (ওবিই) চালু করে। ওবিইর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ফলাফলকে প্রাসঙ্গিক, পরিমাপযোগ্য এবং শিক্ষার্থী, শিল্প ও সমাজের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর জোর দেয়া। প্রচলিত শিক্ষায় যেখানে শিক্ষককেন্দ্রিক পাঠদানই প্রধান, সেখানে ওবিই গুরুত্ব দেয় শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কী অর্জন করছে তার ওপর। এ কারণে বিশ্বজুড়ে ওবিই উচ্চশিক্ষায় ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে।
কিন্তু চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে ওবিই নতুন এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। ওবিইর কাঠামোটিতে অভিযোজনক্ষম দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত নেই। অথচ এ দক্ষতাই আজকের দিনে কর্মক্ষেত্র ও সমাজে টিকে থাকার শর্ত। ওবিইর ধারণা গড়ে ওঠে ১৯৮০-এর দশকে, আমেরিকান শিক্ষাবিদ উইলিয়াম স্প্যাডির কাজের মাধ্যমে। ব্লউমের ট্যাক্সোনমি এ ধারণাকে কাঠামো দেয়—যেখানে নিচু স্তরের দক্ষতা (স্মরণ, বোঝা, প্রয়োগ) থেকে শুরু করে উচ্চ স্তরের দক্ষতা (বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন, সৃজন) পর্যন্ত ধাপে ধাপে সাজানো হয়। ফলে পাঠ্যক্রম, শেখানো আর মূল্যায়নকে সমন্বিতভাবে সাজানো সম্ভব হয়েছিল।
কিন্তু আজকের বিশ্ব ১৯৮০-এর বা তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের (১৯৫০-২০১৪) সময়ের মতো নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, বিগ ডাটা, অটোমেশন আর বায়োটেকনোলজি দ্রুতগতিতে বদলে দিচ্ছে কাজ, অর্থনীতি আর সমাজকে। কর্মক্ষেত্রে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান এখন আর যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের চাই অভিযোজনক্ষম দক্ষতা—নমনীয়তা, সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, ধৈর্য, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, উদ্যোক্তা মানসিকতা আর আজীবন শেখার অঙ্গীকার। এগুলো ‘সফট’ স্কিল নয়—বরং অনিশ্চয়তায় টিকে থাকা, ভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় করা আর অজানা পরিস্থিতিতে উদ্ভাবন করার হাতিয়ার।
বিশ্বজুড়ে অধিকাংশ অ্যাক্রেডিটেশন সংস্থাগুলো এরই মধ্যে ওবিইকে মানদণ্ড হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু অভিযোজনক্ষম দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত না করলে ওবিই কেবল কাগজে-কলমে চেকলিস্ট পূরণ করা স্নাতক তৈরি করবে—যারা বাস্তবের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে ব্যর্থ হবে। এখন ক্যারিয়ার আর সরলরেখায় চলে না; মানুষকে ঘন ঘন কর্মক্ষেত্র ও পেশা বদলাতে হয়। অভিযোজনক্ষম দক্ষতাই তাদের বারবার শেখা, দক্ষতা বাড়ানো ও পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করার শক্তি দেয়—একই সঙ্গে নিশ্চিত করে যে প্রযুক্তি মানুষকে প্রতিস্থাপন নয়, বরং শক্তিশালী করে।
অভিযোজনক্ষম দক্ষতা কোনো স্থির জিনিস নয়; এটি শেখা, ভুলে যাওয়া এবং পুনরায় শেখার চলমান প্রক্রিয়া। হার্ড স্কিল দ্রুত পুরনো হয়ে যায়, কিন্তু অভিযোজনক্ষম দক্ষতা মানুষকে সব সময় প্রাসঙ্গিক ও সক্ষম রাখে। আগামীর ইন্ডাস্ট্রি ৫.০-এর যুগে মানুষ কাজ করবে বুদ্ধিমান মেশিনের পাশাপাশি। এখানে অভিযোজনক্ষম দক্ষতাই মানুষকে সাহায্য করবে অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগাতে, অথচ মানবিক গুণাবলি—সহমর্মিতা, নৈতিক বিচারবোধ, সৃজনশীলতা—অক্ষুণ্ণ রাখতে।
এখন ছবিটা স্পষ্ট: বর্তমান ওবিই কাঠামোতে বড় এক ফাঁক রয়ে গেছে। যদি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সত্যিই শিক্ষার্থীদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করতে চায়, তবে অভিযোজনক্ষম দক্ষতাকে পাঠ্যক্রম, শেখানোর কৌশল আর মূল্যায়নের মধ্যে সচেতনভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এর সঙ্গে আরেকটি সংকটও সামনে—আজকের শিক্ষার্থীরা গুগল, ইউটিউব আর এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে মুহূর্তে উত্তর খোঁজে। তাদের কাছে গতি আর প্রাসঙ্গিকতা মুখ্য, গভীর ও ধীর শেখা নয়। ফলে ‘সেমিস্টারভিত্তিক, হয়তো কাজে লাগবে’ ধরনের প্রচলিত শেখানো ক্রমেই বিতর্কিত হয়ে পড়ছে।
কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ পরিবর্তনগুলো কার্যকরভাবে কারিকুলাম, শিক্ষাদান ও মূল্যায়নে সমন্বয় করবে, তা এখন দেখার বিষয়।
এমএম শহিদুল হাসান : ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি এবং সাবেক উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি