খাদ্যনিরাপত্তা

রূপশালি ধান ও কৃষির রূপান্তর

রুশিদান ইসলাম রহমান | মতামত
আগস্ট ২৬, ২০২৫
রূপশালি ধান ও কৃষির রূপান্তর
রুশিদান ইসলাম রহমান

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে বিশাল পরিবর্তন হয়েছে, অগ্রগতি হয়েছে তা বহুল আলোচিত। সেই তুলনায় কৃষির যে পরিবর্তন, গ্রামীণ দৃশ্যপটের যে পরিবর্তন, তার আলোচনা হয়েছে কম।

 

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে বিশাল পরিবর্তন হয়েছে, অগ্রগতি হয়েছে তা বহুল আলোচিত। সেই তুলনায় কৃষির যে পরিবর্তন, গ্রামীণ দৃশ্যপটের যে পরিবর্তন, তার আলোচনা হয়েছে কম। আরো কম মনোযোগ পাচ্ছে সামনের কয়েক দশকে এ পরিবর্তন কি সরলরৈখিকভাবে চলতে থাকবে, নাকি নতুন বাঁক নেবে সেই প্রসঙ্গটি।

কৃষির পরিবর্তন অর্থ আসলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষি ও অকৃষির গুরুত্বের পরিবর্তন, সেসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির পরিবর্তন। এখন থেকে পাঁচ দশক আগে এ দেশের কৃষি বলতে ধান-পাট চাষকেই বোঝাত। তার মধ্যে আধিপত্যে ছিল ধান। সেই গুরুত্ব কীভাবে বদল হলো, তার কী প্রভাব, আর পুরনো কালের ধানের গীত এ লেখাতে।

ধানের ইতিহাস, বিভিন্ন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি আসলে এ দেশের আর্থ-সামাজিক ইতিহাসেরই একটি অংশ। শুধু রাজা-রাজড়ার বা শাসকগোষ্ঠীর ইতিহাস, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কাহিনীই একটি দেশের পুরো ইতিহাসকে ধরতে পারে না। সাধারণ জনগোষ্ঠীর জীবন যাপন, উপার্জন কাজ, প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রচেষ্টার যে ইতিহাস, তার গুরুত্ব বিশ্বজুড়েই এখন স্বীকৃত। সেই ইতিহাস পর্যালোচনার শুরু হতে পারে গ্রামীণ জীবন ও কৃষির ইতিহাসের হাত ধরে। ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্যের সঙ্গেও এ জীবনধারার যোগ। কবিতা গল্পে গ্রামীণ জীবনের, শস্য আর প্রকৃতির যেসব উল্লেখ থাকে সেগুলোর ভাব-উপলব্ধি অসম্ভব হবে সেগুলোর সঙ্গে পরিচয় ছাড়া।

রূপসী বাংলার রূপ বর্ণনাতে জীবনানন্দের কবিতায় এসেছে, ‘‌...সবচেয়ে করুণ সুন্দর’...সেখানে এসেছে কলমীর ফুল, হিজল, মধুকূপী ঘাস, সেসব পঙ্‌ক্তিমালায় বারবার এসেছে ধানের নানা নাম, বাসমতি, বালাম ও শালি ধান, বলেছেন, "রূপশালি ধান তাহা।

পাঁচ দশক আগে এ দেশে যেসব স্থানীয় প্রজাতির ধান চাষ হতো, সেগুলের নাম কিন্তু ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে চলে যাচ্ছে। তার পরিবর্তে নতুন উচ্চফলনশীল ধান এসেছে। সেগুলোর চাষের পদ্ধতি ভিন্ন। তাতে ফলন বেড়েছে এত বেশি, যেটা এক সময় ছিল অকল্পনীয়। ফলে এ দেশের জনসংখ্যা যখন বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে, খাদ্যশস্যের অভাব নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। এ ধানের সুফল এবং সঙ্গে যেসব পরিবর্তন হয়েছে, সেই প্রসঙ্গ তাই গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন ধানের প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে বড় আশীর্বাদ। কিন্তু এ দেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত যেসব ধানের নাম সেগুলো বিস্মৃত হওয়াটাই কি সমীচীন! সেগুলোর সৌন্দর্য শুধু স্মরণীয় তা নয়, সেগুলো স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে যেভাবে খাপ খাইয়ে নিত, তা থেকে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। দু-একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

নতুন উফশী ধান প্রধানত শুষ্ক মৌসুমে গভীর-অগভীর নলকূপ দিয়ে সেচের মাধ্যমে চাষ হয়। এ প্রযুক্তি আসার আগে বৃষ্টি নির্ভর ধান চাষ হতো। বর্ষায় নিচু জমিতে সেই ধান ছিল পানির ওপর নির্ভরশীল। মৌসুমি বৃষ্টির ধারা চলত, পানি বাড়ত, সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ত ধানগাছগুলোর দৈর্ঘ্য। শেষে ভেজা জমি থেকে কাটা হতো ধান। এ ধান আউশ মৌসুমেও হতো, ‘‌যখন কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা’ আর কবিতার সেই"‘সোনার তরী’তে তুলে দেয়া হলো সব ধান। সেটা আউশ ধান কিনা, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক।

রংপুরের কিছু এলাকায় আউশ ও আমন ধান একত্রে ছিটিয়ে বোনা হতো। আউশ ধান কাটার সময় জমিতে পানি থাকত। ধান কাটার সময় আমন ধানের চারাও কাটা পড়ত। পরে সেগুলো আপনা থেকেই আবার বেড়ে উঠত। এ পদ্ধতি দেখা গিয়েছিল ১৯৭৪ সালে যখন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থায় একজন শিক্ষকের নেতৃত্বে কিছু গ্রামে জরিপের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণার সঙ্গে জড়িত হয়েছিলাম। এসব চাষ পদ্ধতিগুলো তখন কৃষকদের পারিবারিক পরম্পরায় নিজেদের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত হয়ে চলতে থাকত।

সেকালে আউশ, আমন, বোরো—তিন মৌসুমের মধ্যে প্রধানত আউশ ও আমন মৌসুমেই বেশির ভাগ জমিতে ধান চাষ হতো। প্রতি মৌসুমেই নানা জাতের নানা নামের ধান হতো। দুটি নামের সঙ্গে বর্তমানের ক্রেতারা বহুল পরিচিত—কালিজিরা ও কাটারিভোগ। এগুলোর উৎপাদন আশা করা যায় টেকসই হবে। এগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিও দেয়া হয়েছে।

আরো যেসব নাম ও যেগুলোর আবাদ হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর নাম, ইতিহাস এবং সম্ভব হলে গবেষণাগারে আবাদ চালিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যময় ধানের রূপ-বর্ণ-গন্ধ ধরে রেখে আগামী প্রজন্মের জ্ঞানভাণ্ডারসমৃদ্ধ করার চেষ্টা করা বাঞ্ছনীয়।

ধানের নাম খুঁজতে গিয়ে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন উৎস থেকে কিছু নাম পাওয়া যায়। এখনো হয়তো গ্রামাঞ্চলে প্রবীণ কৃষকদের মধ্যে অনুসন্ধান করে আরো কিছু জোগাড় করা সম্ভব। একটি উদাহরণ দিই, কটক তারা নামের সুগন্ধি চাল হতো কুমিল্লার নিম্নাঞ্চলে, যেখানে নৌকা ছাড়া পৌঁছা যেত না। তা দিয়ে পিঠা আর চিড়া হতো। বেশকিছু বছর হয়েছে, পাকা রাস্তা ধরে ঢাকা থেকে সেসব গ্রামে পৌঁছে যাওয়া যায় ৬-৭ ঘণ্টায়। বর্ষার ধানের পরিবর্তে শীতকালে উফশী বোরো চাষ হয়।

সেকালের ধানগুলো কোথায় গেল! সেই জল ভরভর ধানখেতের ভেতর দিয়ে নৌকা চলত, নৌকাগুলো সাবধানে আল বরাবর চলার চেষ্টা করত। তবু সেই ধানের সঙ্গে স্পর্শ বাঁচিয়ে চলা অসম্ভব হতো। ধানের পাতায় শিরশির শব্দে কান পেতে কোনো এক কবির মনে হতো, আরেকটু হলে, বোঝা যাবে জলপরী কী গল্প বলে। সেই সবুজের রঙ, ধানের পাতার গান, সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আর কেউ ভেসে যাবে না। এখন আর সেই গভীর পানির ধান চাষ হয় না।

শালি ধানের নানা ধরনের উল্লেখ পেয়েছি কিছু গবেষণাপত্রে। স্বর্ণ শাইল নাম আছে সেখানে। মনে হয় জীবনানন্দের রূপশালি হয়তো আসলে রূপাশাইল। বাংলা একাডেমির অভিধানে রূপশালি উল্লেখ আছে, সম্ভবত জীবনানন্দের কবিতায় স্থান পেয়েছে তাই; অন্য কোনো শালি ধানের নাম উল্লেখ নেই।

দেশের খাদ্য চাহিদা মেটাতে অবশ্য শুধু ধান চাষের আধুনিক প্রযুক্তিতে থেমে থাকা যাবে না। আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের ধরনও পাল্টে যাচ্ছে। এ দেশে যখন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় বেড়েছে, তখন খাদ্যশস্য, বিশেষত চালের পরিমাণ বেড়েছে দৈনিক খাদ্য গ্রহণে। কিন্তু যখন আয় আরো বেড়েছে, খাদ্যের মধ্যে চালের অংশ আর বাড়ছে না। বরং জরিপে দেখা যায়, শহরাঞ্চলে তা সামান্য হলেও কমেছে। অর্থাৎ বর্ধিত আয়ের ফলে প্রোটিনযুক্ত খাবার, ফল ইত্যাদি অধিকতর ব্যয়সাপেক্ষ খাবার চালের জায়গা কিছুটা দখল করছে।

সুতরাং ভবিষ্যতে কৃষির রূপান্তরের ধারাতে আবারো পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সেখানে এমন শস্য-ফল-সবজি উৎপাদন করার প্রযুক্তি তৈরির পথে অগ্রসর হতে হবে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মঙ্গলকর, পরিবেশের জন্যও সহায়ক।

উচ্চফলনশীল ধানে পানির, বিশেষত সেচের পানির ব্যবহার বাড়ছে। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। কাজেই পানির সরবরাহ একেবারে পানির দরে অর্থাৎ সস্তায় হবে না। দেশে কৃষিজমিও আর বাড়ছে না, বরং বাড়ি-ঘর পথ-ঘাটের ও শিল্প কারখানার দখলে চলে যাচ্ছে কিছুটা। সুতরাং গবেষণা করা দরকার, কম জমি, কম পানি ব্যবহার করে কী ধরনের খাদ্য উৎপাদন করা যায়, প্রয়োজনে প্রক্রিয়াজাত করা যায়।

আরো দূরবর্তী সময়ের দিকে কল্পনাকে প্রসারিত করা যাক। আয় বেড়ে উন্নত দেশ যখন হব আমরা, তখন আরো স্বাস্থ্যসম্মত সুখাদ্য প্রয়োজন হবে। ততদিনে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমবে। শুধু তা-ই নয়, একপর্যায়ে জনসংখ্যা কমা শুরু হবে। ধান-চাল উৎপাদনের প্রয়োজন কমবে সেই সঙ্গে।

কোনো এক সময় আসবে, যখন ধানের ফলন বাড়ানোর চেয়েও বেশি প্রয়োজন হবে স্বাদের বৈচিত্র্য! তখন হয়তো ধানের যেসব প্রজাতি অতীতে সমাদৃত হতো সেগুলোকে ফিরিয়ে আনার আগ্রহ জাগবে। তাই শুধু ইতিহাস হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ দিনের জন্য, আমাদের ধানের প্রজাতিগুলোকে যতটা সম্ভব সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করতে হবে। কয়েক প্রজন্ম পরের মানুষের আনন্দ-জীবনমান বাড়ানোর ভাবনা কি খুব বেশি সুদূর কল্পনা!

 

রুশিদান ইসলাম রহমান : অর্থনীতিবিদ ও গবেষক

 

লেখা : বাণিক বার্তা

মতামত'র অন্যান্য খবর

সর্বশেষ